প্রযুক্তির দুনিয়ায় সময় যেন রকেটের গতিতে চলে। এই তো সেদিন, আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI দিয়ে ছবি তৈরি করা দেখে অবাক হচ্ছিলাম। আর আজ, সেই AI আমাদের লেখা কয়েকটি শব্দকে ভিত্তি করে তৈরি করে দিচ্ছে জীবন্ত, বাস্তবসম্মত এবং সিনেম্যাটিক ভিডিও। ২০২৩ সাল যদি হয় AI ইমেজের উত্থানের বছর, তবে ২০২৪ সাল থেকে শুরু হয়েছে টেক্সট থেকে ভিডিও এআই প্রযুক্তির এক নতুন বিপ্লব।
এই বিপ্লবের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি নাম, যারা একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে: গুগলের Veo 3.1 এবং OpenAI-এর Sora 2। দুটি টুলই অবিশ্বাস্য ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু তাদের পথচলার দর্শন এবং লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি আপনাকে দিচ্ছে পরিচালকের চেয়ার, অন্যটি দিচ্ছে জাদুকরের ছড়ি।
আপনি যদি একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর, বিজ্ঞাপন নির্মাতা, চলচ্চিত্র শিক্ষার্থী অথবা শুধুই একজন প্রযুক্তিপ্রেমী হন, তবে এই দুটি টুলের লড়াই আপনার জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে। চলুন, আজ আমরা গভীরে গিয়ে জানার চেষ্টা করি, আপনার কাজের ধরন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কোনটি হতে পারে আপনার জন্য সেরা AI ভিডিও জেনারেটর।
গুগল Veo 3.1: আপনার সৃজনশীলতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ
গুগল বরাবরই ব্যবহারকারীকে ক্ষমতা দিতে বিশ্বাসী। তাদের নতুন Veo 3.1 মডেলটি সেই দর্শনেরই এক চমৎকার উদাহরণ। এটি শুধু একটি ভিডিও জেনারেটর নয়, বরং গুগলের “Flow” নামক একটি পূর্ণাঙ্গ AI ফিল্মমেকিং স্টুডিওর প্রাণকেন্দ্র। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, ভিডিও তৈরির প্রতিটি পর্যায়ে, আইডিয়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সম্পাদনা পর্যন্ত, সম্পূর্ণ সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে তুলে দেওয়া।
শুধু ভিডিও তৈরি নয়, এটি একটি ডিজিটাল এডিটিং স্টুডিও

Veo 3.1-কে যা অন্যদের থেকে মৌলিকভাবে আলাদা করে, তা হলো এর অতুলনীয় এডিটিং ক্ষমতা। গুগলের অফিশিয়াল এআই ব্লগের তথ্য অনুযায়ী, Flow টুলের মধ্যে এমন সব ফিচার যুক্ত করা হয়েছে যা আগে শুধুমাত্র পেশাদার VFX স্টুডিওর পক্ষেই সম্ভব ছিল।
- Insert ও Remove (যুক্ত এবং বিযুক্ত করা): ভাবুন তো, আপনি ঢাকার একটি সুন্দর সকালের ভিডিও তৈরি করেছেন, কিন্তু সেখানে একটি অপ্রয়োজনীয় বিলবোর্ড চলে এসেছে। Veo-এর “Remove” ফিচার ব্যবহার করে আপনি এক ক্লিকেই সেই বিলবোর্ডটি মুছে ফেলতে পারবেন। ঠিক একইভাবে, আপনার পণ্যের বিজ্ঞাপনের জন্য যেকোনো ভিডিওতে আপনার প্রোডাক্টটি নিখুঁতভাবে বসিয়ে দিতে (Insert) পারবেন। টুলটি নিজে থেকেই আলো এবং ছায়ার সামঞ্জস্য রক্ষা করে, যা ফলাফলকে করে তোলে একদম বাস্তবসম্মত।
- Extend (সম্প্রসারণ): আপনার মাথায় একটি ৫ সেকেন্ডের অসাধারণ আইডিয়া এসেছে, কিন্তু সেটিকে একটি ৩০ সেকেন্ডের পূর্ণাঙ্গ গল্পে রূপ দিতে পারছেন না? “Extend” ফিচারটি আপনার ক্লিপের শেষ থেকে গল্পকে নিজে থেকেই এগিয়ে নিয়ে যাবে, যা এক মিনিটেরও বেশি দীর্ঘ হতে পারে।
- Frames to Video (ফ্রেম থেকে ভিডিও): আপনি যদি গল্পের শুরু এবং শেষটা কেমন চান, তা দুটি ছবি দিয়ে Veo-কে বুঝিয়ে দেন, তবে মাঝখানের সম্পূর্ণ পরিবর্তন বা ট্রানজিশনটি এটি নিজে থেকেই তৈরি করে দেবে। এটি গল্প বলার প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ করে দিয়েছে।
ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ এখন আপনার হাতের মুঠোয়
একজন ভালো পরিচালকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ক্যামেরার শৈল্পিক ব্যবহার। Veo 3.1 আপনাকে সেই ক্ষমতা দেয়। ড্রোন দিয়ে ওপর থেকে নেওয়া শট (aerial shot), দ্রুত জুম ইন করা, অথবা কোনো চরিত্রকে অনুসরণ করে ক্যামেরা ঘোরানো (panning shot), এই সব জটিল ক্যামেরা মুভমেন্ট এখন আপনি সাধারণ টেক্সট কমান্ড দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এর জন্য আপনার দামি ক্যামেরা বা ড্রোন অপারেটরের প্রয়োজন নেই।
গুগলের লক্ষ্য পরিষ্কার: Veo 3.1 হবে পেশাদারদের বিশ্বস্ত সহকারী। যারা বিজ্ঞাপন, শর্ট ফিল্ম বা মিউজিক ভিডিও বানান, তাদের জন্য এই এআই ভিডিও এডিটিং টুলটি কাজের প্রক্রিয়াকে আমূল বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
OpenAI Sora 2: বাস্তবতার এক ডিজিটাল আয়না
OpenAI যখন প্রথম Sora-এর ডেমো দেখায়, তখন প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে একপ্রকার আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। এর তৈরি করা ভিডিওগুলো এতটাই বাস্তবসম্মত ছিল যে সত্যি এবং মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। Sora 2 সেই বিস্ময়কে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। OpenAI-এর দর্শন ভিন্ন। তারা শুধু সুন্দর ভিডিও বানাতে চায় না, বরং তারা চায় তাদের AI যেন বাস্তব জগতের নিয়মকানুন, যেমন পদার্থবিজ্ঞান এবং কার্যকারণ সম্পর্ক (cause and effect) বুঝতে পারে।
‘Cameo’ ফিচার: এখন আপনিই আপনার কল্পনার গল্পের নায়ক

Sora 2-এর সবচেয়ে আলোচিত এবং যুগান্তকারী ফিচার হলো “Cameo”। OpenAI-এর অফিশিয়াল ঘোষণা অনুযায়ী, এই ফিচারের মাধ্যমে আপনি আপনার নিজের বা যেকোনো বন্ধুর মাত্র ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ আপলোড করতে পারবেন। এরপর Sora 2-কে যেকোনো নির্দেশ দিলেই সে আপনাকে সেই ভিডিওর প্রধান চরিত্রে বসিয়ে দেবে। শুধু আপনার চেহারা নয়, আপনার কণ্ঠস্বর এবং কথা বলার ভঙ্গিও এটি অনুকরণ করতে পারবে। ভাবুন তো, নিজেকে একটি ঐতিহাসিক সিনেমার চরিত্রে বা মঙ্গল গ্রহে হাঁটার দৃশ্যে দেখার অভিজ্ঞতা কেমন হবে!
ফিজিক্স এবং বাস্তবতার প্রতি গভীর মনোযোগ
Sora 2-কে যা অন্যদের থেকে আলাদা করে তা হলো বাস্তবতার প্রতি এর গভীর মনোযোগ। একটি বল বাউন্স করলে কতটা উপরে উঠবে, বা ঢেউ এসে বালির তীরে কীভাবে মিলিয়ে যায়, এই ছোট ছোট বিষয়গুলো Sora 2 খুব ভালোভাবে অনুকরণ করতে পারে। এর কারণ হলো, এটি শুধু পিক্সেলের বিন্যাস দেখে শেখে না, এটি একটি ভার্চুয়াল জগৎ তৈরি করে সেই জগতের নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করে। এই কারণে এর ভিডিওগুলো দেখতে শুধু সুন্দরই নয়, অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্যও মনে হয়।
Sora অ্যাপ: শুধু টুল নয়, একটি সামাজিক প্ল্যাটফর্ম
OpenAI শুধু একটি টুল তৈরি করেই থেমে থাকেনি। তারা “Sora” নামে একটি মোবাইল অ্যাপও নিয়ে এসেছে, যা অনেকটা পরবর্তী প্রজন্মের TikTok-এর মতো কাজ করে। এখানে ব্যবহারকারীরা শুধু ভিডিও তৈরিই করতে পারবেন না, বরং অন্যের তৈরি ভিডিও “রিমিক্স” করতে পারবেন, টেমপ্লেট ব্যবহার করতে পারবেন এবং নিজেদের “Cameo” দিয়ে মজাদার কনটেন্ট তৈরি করে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে পারবেন। এর লক্ষ্য হলো, ভিডিও তৈরিকে সবার জন্য সহজ, মজাদার এবং সামাজিক করে তোলা।
দুই মহারথীর দুই দর্শন: নিয়ন্ত্রণ বনাম বাস্তবতা
Veo 3.1 এবং Sora 2-এর মধ্যে কোনটি সেরা, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে তাদের পেছনের দর্শনটা বোঝা জরুরি।
- গুগল Veo 3.1 হলো একজন পেশাদার শিল্পীর স্টুডিও। এটি আপনাকে সেরা ক্যানভাস, সব রঙ এবং সব ধরনের তুলি দিয়ে বলবে, “এবার আপনার কল্পনাকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলুন।” এখানে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে। এটি তাদের জন্য, যারা নিজেদের ভাবনার প্রতিটি অংশকে নিখুঁতভাবে পর্দায় দেখতে চান।
- OpenAI Sora 2 হলো আলাদিনের চেরাগের দৈত্য। আপনি শুধু আপনার ইচ্ছাটা বলবেন, আর সে আপনার সামনে একটি বিস্ময়কর দৃশ্য তৈরি করে দেবে। এটি দ্রুত, সহজ এবং ফলাফল প্রায়শই আপনার কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। এটি তাদের জন্য, যারা দ্রুত আইডিয়াকে বাস্তবে রূপ দিতে চান কোনো জটিলতা ছাড়াই।
সুতরাং, এটি পেশাদার নিয়ন্ত্রণের (Professional Control) সাথে সহজ সৃজনশীলতার (Effortless Creativity) লড়াই।
আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সেরা AI ভিডিও জেনারেটর কোনটি?
এখন মূল প্রশ্ন হলো, আপনার কাজের জন্য কোনটি বেশি কার্যকরী হবে?

ব্র্যান্ড মার্কেটার এবং বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের জন্য
আপনি যদি কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন বা ব্র্যান্ডের জন্য কনটেন্ট তৈরি করেন, তবে Veo 3.1 আপনার জন্য সেরা পছন্দ। এর “Insert” ফিচারের মাধ্যমে আপনি যেকোনো ভিডিওতে আপনার পণ্যটি এমনভাবে যুক্ত করতে পারবেন যেন এটি শুটিংয়ের সময়ই সেখানে ছিল। এই স্তরের নিয়ন্ত্রণ ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য অপরিহার্য।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার এবং গল্পকারদের জন্য
যারা স্বল্প বাজেটে শর্ট ফিল্ম বা ওয়েব সিরিজ তৈরি করতে চান, তাদের জন্য দুটি টুলই আশীর্বাদ। Sora 2 ব্যবহার করে তারা খুব দ্রুত কনসেপ্ট বা প্রি-ভিজ্যুয়ালাইজেশন তৈরি করতে পারবেন। অন্যদিকে, Veo 3.1 ব্যবহার করে তারা চূড়ান্ত শট তৈরি এবং সম্পাদনা করতে পারবেন, যা পোস্ট-প্রোডাকশনের খরচ এবং সময় নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেবে।
সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য
আপনি যদি TikTok, Instagram বা YouTube-এর জন্য মজাদার এবং ভাইরাল কনটেন্ট তৈরি করতে চান, তবে Sora 2 এবং এর “Cameo” ফিচার আপনার জন্য এক নতুন দুনিয়া খুলে দেবে। এটি আপনাকে এমন সব কনটেন্ট তৈরির সুযোগ দেবে যা আগে ছিল অকল্পনীয়।
আজকের দিনে AI মডেলগুলো আমাদের কাজের প্রক্রিয়াকে বদলে দিচ্ছে। যেভাবে বিভিন্ন টুলস যেমন: Claude AI ব্যবহার গাইড (২০২৫): এই স্মার্ট AI কিভাবে ব্যবহার করবেন আমাদের লেখা বা গবেষণার পদ্ধতিকে সহজ করে দিচ্ছে, সেভাবেই গুগল Veo 3.1 এবং OpenAI Sora 2 আমাদের গল্প বলার ধরনকে চিরতরে পাল্টে দিতে প্রস্তুত।
লেখকের অভিজ্ঞতা
বিডি ব্লিংকের জন্য একটি ভিডিও তৈরি করতে গিয়ে আমি সম্প্রতি একটি সমস্যায় পড়েছিলাম। আমাদের আইডিয়া ছিল, ঢাকার ব্যস্ত রাস্তায় একটি চলন্ত সিএনজির পেছনে আমাদের লোগো দেখা যাবে। ঐতিহ্যগতভাবে, এই কাজটি করার জন্য আমাদের একজন মোশন গ্রাফিক্স আর্টিস্টের প্রয়োজন ছিল, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। ঠিক সেই সময়ে আমি Veo 3.1-এর আর্লি অ্যাক্সেস পাই। আমি শুধু একটি সাধারণ সিএনজির ফুটেজ এবং আমাদের লোগোটি আপলোড করে কমান্ড দিলাম: “এই লোগোটি চলন্ত সিএনজির পেছনে এমনভাবে যুক্ত করো যেন মনে হয় এটি সেখানেই আঁকা ছিল।” আমি অবাক হয়ে দেখলাম, Veo শুধু লোগোটি নিখুঁতভাবে বসিয়েই দেয়নি, বরং রাস্তার বাঁকের সাথে, গাড়ির গতির সাথে এবং বদলাতে থাকা আলোর সাথে লোগোর উজ্জ্বলতা ও ছায়াকেও মানিয়ে নিয়েছে। যে কাজটি করতে কয়েক ঘণ্টা লাগত, সেটি হলো মাত্র কয়েক মিনিটে। সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, এই প্রযুক্তি শুধু আমাদের সময় বাঁচাবে না, আমাদের মতো ছোট কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কল্পনার সীমানাকেও বহুদূর বাড়িয়ে দেবে।
সারসংক্ষেপ: প্রতিযোগিতা নয়, ভবিষ্যতের সহযোগী
শেষ পর্যন্ত, Veo 3.1 এবং Sora 2-কে প্রতিযোগী হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের সৃজনশীল সহযোগী হিসেবে দেখাই ভালো।
- Veo 3.1 আপনার ভেতরের পরিচালককে জাগিয়ে তুলবে এবং আপনার ভাবনাকে নিখুঁতভাবে পর্দায় আনার ক্ষমতা দেবে।
- Sora 2 আপনার কল্পনাকে ডানা দেবে এবং এমন সব দৃশ্য তৈরি করবে যা আপনি হয়তো ভাবতেও পারেননি।
এই দুটি টুলই সৃজনশীলতার নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, আমরা সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করে কতটা বিস্ময়কর জগৎ তৈরি করতে পারি।








